দুটি দিন মনের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে। স্বস্তি পাচ্ছিলেন না কোনো কিছুতেই। গত মঙ্গলবার তাই চট্টগ্রামে গিয়ে একটি ম্যাচ খেলে এসেছেন। আবদুর রাজ্জাক হাসতে হাসতে বললেন, ‘১০ বছর পর খ্যাপ খেললাম। এমনিতে এসব আমার ভালো লাগে না। কিন্তু মনটা এত খারাপ ছিল যে, ভাবলাম খেলা আর আড্ডাও হবে, ঘোরাও হবে। মনটা যদি ফ্রেশ হয়!’
সেই খ্যাপ খেলতে গিয়ে হোক বা হতাশার ক্ষতে সময়ের প্রলেপে, রাজ্জাকের বিপর্যস্ত মনটা একটু শান্ত হয়েছে। বিশ্বকাপ দল ঘোষণার দিন গোটা পৃথিবীকে মনে হচ্ছিল মিথ্যা। এখন মন বলছে, বিশ্বকাপই পৃথিবীর শেষ নয়। শেষ নয় তাই রাজ্জাকের ক্যারিয়ারও।
৩২ বছর বয়সে স্পিনারদের ‘বুড়ো’ বলা অন্যায়। তবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের হিসাবটা বরাবরই আলাদা। ৩০ ছোঁয়ার আগে ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেল কতজনের! রাজ্জাক বিশ্বকাপ দলে উপেক্ষিত হওয়ার পর তাই তাঁর শেষও দেখে ফেলেছেন অনেকে। গুঞ্জন, আলোচনা, সংশয়, প্রশ্ন...ওয়ানডেতে ২০০ উইকেট নেওয়া বাংলাদেশের একমাত্র বোলারের ক্যারিয়ারের ইতি এখানেই?
প্রত্যয়ী কণ্ঠে রাজ্জাকের জবাব, ‘প্রশ্নই ওঠে না। বিশ্বকাপ অনেক বড় টুর্নামেন্ট, খেলতে পারছি না বলে খুব হতাশ। তবে দলে নাম না দেখে যখন প্রচণ্ড খারাপ লেগেছে, তখনো ভাবিনি যে ক্যারিয়ার শেষ। এখনো ভাবছি না। আমার শেষ এখনো অনেক অনেক দূরে। শেষের সময় এলে নিজেই জানব এবং জানাব। এখন তো অবসর নিয়ে ভাবার সময়ও হয়নি।’
বিশ্বকাপ দল ঘোষণার সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদও আশার ছবি মেলে ধরেছেন রাজ্জাকের সামনে, ‘অস্ট্রেলিয়ায় মাঠগুলো অনেক বড়। ফিটনেস ও ফিল্ডিং সামর্থ্যকে আমরা জোর বিবেচনায় নিয়েছি। এসব রাজ্জাকের বিপক্ষে গেছে। তবে বিশ্বকাপ তো একটা টুর্নামেন্ট মাত্র। বিশ্বকাপের পর এ বছরই চারটি হোম সিরিজ বাংলাদেশের। আশা করি, রাজ্জাক ফিটনেস নিয়ে কাজ করবে এবং ফিরে আসবে আবার।’ কাল কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের কথাকেও অনুপ্রেরণা হিসেবে নিতে পারেন অভিজ্ঞ স্পিনার, ‘রাজ্জাক বাংলাদেশ ক্রিকেটকে অনেক কিছু দিয়েছে অনেক দিন ধরে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে জিম্বাবুয়ে সিরিজের আগে ও ইনজুরিতে পড়ে আর সুযোগ পেয়ে অন্য স্পিনাররাও ভালো করেছে। ও এখনো ভালো ক্রিকেটার। পারফর্ম করলে অবশ্যই ফেরার সুযোগ আছে।
যদিও গুঞ্জন আছে,
কোচের খুব একটা সুনজরে
নেই রাজ্জাক।
নির্বাচকেরা শুধু আশার
বাণীই শুনিয়েছেন, নাকি সত্যিই
বিবেচনায় রাখা হবে, সেটির
উত্তরও মিলবে সময়ে। আপাতত জোর
দাবি জানানোর জায়গাটায় নিজেকে
নিয়ে যেতে চান রাজ্জাক। নিজেকে তৈরি
করতে চান নির্বাচকদের প্রেসক্রিপশন
মেনেই, ‘নির্বাচকদের সিদ্ধান্তের ওপর
আমার শ্রদ্ধা আছে। চেষ্টা করব
তাঁদের চাওয়া পূরণ করতে। সামনে জাতীয়
লিগ আছে, চেষ্টা করব
পারফর্ম করতে।
ফিটনেস-ফিল্ডিংয়ে উন্নতি দেখতে
চান তাঁরা, আমি চেষ্টার
কমতি রাখব না করে
দেখাতে। ফেরার
জন্য যা যা করতে
হয়,
সব
করব।’
গত বছর পারফরম্যান্সও আসলে রাজ্জাকের পক্ষে কথা বলেনি। বছরজুড়ে লড়তে হয়েছে চোটের সঙ্গেও। এশিয়া কাপে ছিল চোট, হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট থেকে সেরে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ছন্দ ফিরে পাননি।
গত বছর পারফরম্যান্সও আসলে রাজ্জাকের পক্ষে কথা বলেনি। বছরজুড়ে লড়তে হয়েছে চোটের সঙ্গেও। এশিয়া কাপে ছিল চোট, হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট থেকে সেরে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ছন্দ ফিরে পাননি।
জিম্বাবুয়ে সিরিজের
আগে আবার হ্যামস্ট্রিং। ফিটনেসে যে
ঘাটতির কথা নির্বাচকেরা বলছেন,
রাজ্জাক সেটির দায়ও দিলেন
পিছু না-ছাড়া চোটকে। তবে চোটের
সঙ্গে যুদ্ধে আপাতত জিতেছেন। প্রিমিয়ার লিগে
পারফরম্যান্সও ভালোই ছিল। ১০ ম্যাচে
উইকেট পেয়েছেন ২১টি। দল সুপার
লিগে উঠলে হয়তো বল
হাতে আরও জোর দাবি
জানাতে পারতেন।
তবে সেটা নিয়ে আক্ষেপ
নেই রাজ্জাকের, ‘বোলিংয়ের কারণে
তো নয়, বাদ দেওয়া
হয়েছে ফিটনেসের কারণে। সুপার লিগে
আরও উইকেট পেলেও হয়তো
লাভ হতো না।’
তবে নির্বাচকেরা যতই ফিটনেসের
কথা বলুন, বাস্তবতা হলো,
ফিল্ডিং কখনোই খুব বড়
শক্তি ছিল না রাজ্জাকের। এটাও সত্যি
যে,
বাংলাদেশ দলে কয়েকজনকে বাদ
দিয়ে বাকি সবাই গড়পড়তা
মানের ফিল্ডার।
সানি-তাইজুল-জুবায়েরদের উত্থানও
তাই বড় ভূমিকা রেখেছে
রাজ্জাকের বাইরে চলে যাওয়ায়। এটা জানেন
রাজ্জাকও। ক্যারিয়ারের
এই
পর্যায়ে এসে কঠিন লড়াইয়ের
আঁচে তাই চাঙা হচ্ছেন,
‘চ্যালেঞ্জ অবশ্যই। ক্যারিয়ারের এই
পর্যায় বলে নয়, প্রতিটি
সিরিজকেই আমি সব সময়
চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। আর বাংলাদেশে
স্পিনে জায়গা নিয়ে লড়াই
সব
সময়ই ছিল।
এখন হয়তো আরও বেশি। আমি এটাকে
ইতিবাচক হিসেবেই নিচ্ছি। অনেক বিকল্প
থাকলে দলের লাভ। নিজের ভেতরও
বাড়তি তাগিদ আছে। ফেরার জন্য
যা
যা
করতে হয়, করব। হাল ছাড়ব
না। শেষ করব
নিজের ইচ্ছাতেই, বাধ্য হয়ে
নয়।’
অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি রঙিন পোশাকে বাংলাদেশের সফলতম বোলার। নিজের ক্যারিয়ারের ভাগ্য নিজের হাতে লেখার এই লড়াইয়ে বিনা যুদ্ধে কেন হার মানবেন!





